Skip to main content

As-Sunnah Trust

প্রশ্নোত্তর

ক্যাটাগরি

প্রশ্নোত্তর 12

ঈমান

প্রকাশকাল: 10 Feb 2006

প্রশ্ন

আসসালামু আলাইকুম. রাসূলুল্লাহ সঃ কিসের তৈরি? কেউ বলেন তিনি নুরের তৈরি; আবার কেউ বলেন তিনি মাটির তৈরি। তিনি মুলত কিসের তৈরি এসম্পর্ক্যে কুরআন ও হাদিসে যে বর্ণনা আছে তা উল্লেখ পূর্বক প্রশ্নের সঠিক উত্তর চাই! ধন্যবাদ।

উত্তর

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। গুরুত্বপূর্ণ এই প্রশ্নটি করার জন্য আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। নিচে এবিষয়ে সামান্য আলোচনা করা হল, আশা করি আপনি তাতে আপনার উত্তর খুঁজে পাবেন ইনশাল্লাহ। রাসূল সাঃ সৃষ্টিগতভাবে আমাদের মতই মানুষ ছিলেন নূরের তৈরি ছিলেন না। কুরআন-হাদীসে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ সা. অন্যদের মতই মানুষ। এমনকি যুগে যুগে নবী-রাসূলদের দাওআত অস্বীকার করার ক্ষেত্রে অবিশ্বাসীদের প্রধান দাবি ছিল যে নবীগণ তো মানুষ মাত্র এরা আল্লাহর নবী হতে পারেন না। আল্লাহ যদি কাউকে পাঠাতেই চাইতেন তবে ফিরিশতা পাঠিয়ে দিতেন। যেহেতু এরা মানুষ সেহেতু এদের নুবুওয়াতের দাবি মিথ্যা। এদের কথার প্রতিবাদে নবীগণ তাদেরকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে আমরা তোমাদের মত মানুষ এ কথা ঠিক তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষ হলে আল্লাহর ওহী ও নুবুওয়াতের মর্যাদা লাভ করা যায় না। বরং আল্লাহ মানুষদের মধ্য থেকেই যাকে ইচ্ছা নবী বা রাসূল হিসেবে বেছে নেন এ বিষয়ে এখানে কয়েকটি আয়াত এবং হাদীস উল্লেখ করা হল। বাশার بَشَرٌ অর্থ মানুষ মানুষগণ বা মানুষজাতি (man, human being, men, mankind( কুরআন কারীমে প্রায় ৪০ স্থানে বাশারশব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এই একই অর্থে। একবচন ও বহুবচন উভয় অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ সা. বাশার বা মানুষ। এছাড়া উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি অন্যদের মত মানুষ। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন: وَقَالُوا لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الأَرْضِ يَنْبُوعًا أَوْ تَكُونَ لَكَ جَنَّةٌ مِنْ نَخِيلٍ وَعِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الأَنْهَارَ خِلالَهَا تَفْجِيرًا أَوْ تُسْقِطَ السَّمَاءَ كَمَا زَعَمْتَ عَلَيْنَا كِسَفًا أَوْ تَأْتِيَ بِاللَّهِ وَالْمَلائِكَةِ قَبِيلا أَوْ يَكُونَ لَكَ بَيْتٌ مِنْ زُخْرُفٍ أَوْ تَرْقَى فِي السَّمَاءِ وَلَنْ نُؤْمِنَ لِرُقِيِّكَ حَتَّى تُنَزِّلَ عَلَيْنَا كِتَابًا نَقْرَؤُهُ قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلا بَشَرًا رَسُولا وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَنْ يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَى إِلا أَنْ قَالُوا أَبَعَثَ اللَّهُ بَشَرًا رَسُولا এবং তারা বলে কখনই আমরা আপনার প্রতি ঈমান আনব না যতক্ষণ না আপনি আমাদের জন্য ভূমি হতে একটি ঝর্ণাধারা উৎসারিত করবেন। অথবা আপনার একটি খেজুরের ও আঙ্গুরের বাগান হবে যার ফাঁকে ফাঁকে আপনি নদী-নালা প্রবাহিত করে দেবেন। অথবা আপনি যেমন বলে থাকেন তদনুযায়ী আকাশকে খণ্ড-বিখণ্ড করে আমাদের উপর ফেলবেন অথবা আল্লাহ ও ফিরিশতাগণকে আমাদের সামনে এনে উপস্থিত করবেন। অথবা আপনার একটি অলংকৃত স্বর্ণ নির্মিত গৃহ হবে। অথবা আপনি আকাশে আরোহণ করবেন তবে আমরা আপনার আকাশ আরোহণে কখনো বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না আপনি আমাদের (আসমান থেকে) একটি কিতাব অবতীর্ণ করবেন যা আমরা পাঠ করব। বল পবিত্র আমার প্রতিপালক (সুবহানাল্লাহ!)! আমি তো কেবলমাত্র একজন মানুষ একজন রাসূল। আর মানুষের কাছে যখন হেদায়েতের বানী আসে তখন তো তারা শুধু একথা বলে ঈমান আনয়ন করা থেকে বিরত থাকে যে আল্লাহ কি একজন মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন সূরা-আল ইসরা আয়াত ৯০-৯৪। অর্থাৎ কাফিরদের দাবি যে, আল্লাহর রাসূল হওয়ার অর্থ আল্লাহর ক্ষমতার কিছু অংশ লাভ করা। পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ জানালেন যে, রাসূল হওয়ার অর্থ আল্লাহর নিদের্শ অনুসারে প্রচারের দায়িত্ব লাভ, ক্ষমতা লাভ নয়; ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন: قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلا صَالِحًا وَلا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا বল:আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষ মাত্র আমার প্রতি ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তোমাদের মা বুদ (উপাস্য) একমাত্র একই মা বুদ। অতএব যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে। সূরা-আল কাহাফ, আয়াত, ১১০। রাসূলুল্লাহ সা. বারবার তাঁর উম্মতকে বিষয়টি শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি একদিকে যেমন আল্লাহ তাঁকে যে মর্যাদা দান করেছেন তা তাঁর উম্মতরক জানিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে বারবার তাঁর উম্মতকে শিখিয়েছেন যে, তিনি একজন মানুষ। এক হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা) বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সা. সালাতের মধ্যে ভুল করেন। সালামের পরে সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসূল, সালাতের কি কোনো নতুন বিধান নাযিল হয়েছে? তিনি বলেন: তোমরা এ প্রশ্ন করছ কেন? তারা বলেন: আপনি এমন এমন করেছেন। তখন তিনি সালাত পূর্ণ করেন এবং বলেন: إِنَّهُ لَوْ حَدَثَ فِي الصَّلاةِ شَيْءٌ لَنَبَّأْتُكُمْ بِهِ وَلَكِنْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ أَنْسَى كَمَا تَنْسَوْنَ فَإِذَا نَسِيتُ فَذَكِّرُونِي সালাতের নিয়ম পরিবর্তন করা হলে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে জানাতাম। কিন্তু আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ মাত্র। তোমরা যেমন ভুল কর আমিও তেমনি ভুল করি। যদি আমি কখনো ভুল করি তবে তোমরা আমাকে মনে করিয়ে দেবে। বুখারী, আস সাহীহ,কিতাব, বাদউল ওহী, বাব,আত তাওয়াজ্জুহু নাহওয়াল কিবলাতি, হাদীস নং ৪০১। উপরের অর্থে আবূ হুরাইরা, জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ, আনাস ইবনু মালিক, ও অন্যান্য সাহাবী (রাদিয়াল্লাহুম) থেকে অনেক হাদীস সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও সিহাহ সিত্তার অন্যান্য গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। উপরের আয়াত ও হাদীসসমূহে আমরা দেখতে পেলাম যে, আল্লাহ রাসূল সা. কে বিভিন্ন আয়াতে মানুষ বলেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বিভিন্ন হাদীসে নিজেকে মানুষ বলেছেন। রাসূল সা. কে মানুষ বলার পাশাপাশি অনেক আয়াতে মহান মর্যাদার দিক লক্ষ্য করে নূর, বা আল্লাহর নূর,বলা হয়েছে এবং মুফাস্সিরগণ সেখানে নূর অর্থ কুরআন, ইসলাম,মুহাম্মাদ (সা.),ইত্যাদি অর্থ গ্রহণ করেছেন । তবে সেসমস্ত স্থানে রাসূল সা. কে হেদায়াতের আলো ও সঠিক পথের নির্দেশক হিসেবে,নূরবলা হয়েছে, সৃষ্টিগতভাবে নয়। মহান আল্লাহ বলেন: يَاأَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُـنِيرًا হে নবী, আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহবানকারীরূপে এবং আলোকোজ্জ্বল (নূর-প্রদানকারী) প্রদীপরূপে। সূরা- আল আহযাব, আয়াত, ৪৫-৪৬। অপর এক আয়াতে আল্লাহ বলেন: يَاأَهْلَ الْكِـتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُـبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ مِنْ الْكِتَابِ وَيَعْفُو عَنْ كَثـِيـرٍ قَدْ جَاءَكُمْ مِنْ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِيـنٌ হে কিতাবীগণ, আমার রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন, তোমরা কিতাবের যা গোপন করতে তিনি তার অনেক তোমাদের নিকট প্রকাশ করেন এবং অনেক উপেক্ষা করে থাকেন। আল্লাহর নিকট হতে এক নূর ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের নিকট এসেছে। সূরা-আল মায়েদা, আয়াত ১৫। এই আয়াতে নূর বা জ্যোতি বলতে কি বুঝানো হয়েছে সে বিষয়ে মুফাস্সিরগণ মতভেদ করেছেন। কেউ বলেছেন,এখানে নূর অর্থ কুরআন, কেউ বলেছেন, ইসলাম, কেউ বলেছেন, মুহাম্মাদ (সা.)। যারা এখানে নূরঅর্থ মুহাম্মাদ (সা.) বুঝিয়েছেন, তাঁরা দেখেছেন যে, স্পষ্ট কিতাববলতে কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। কাজেই নূরবলতে মুহাম্মাদ (সা.)- কে বুঝানোই স্বাভাবিক। এ বিষয়ে ইমাম তাবারী বলেন, يَعْنِي بِالنُّورِ مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ, الَّذِي أَنَارَ اللَّهُ بِهِ الْحَقَّ, وَأَظْهَرَ بِهِ الإِسْلاَمَ, وَمَحَقَ بِهِ الشِّرْكَ فَهُوَ نُورٌ لِمَنِ اسْتَنَارَ بِهِ يُبَيِّنُ الْحَقَّ, وَمِنْ إِنَارَتِهِ الْحَقَّ تَبْيِينُهُ لِلْيَهُودِ كَثِيرًا مِمَّا كَانُوا يُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ . নূর (আলো) বলতে এখানে মুহাম্মাদ (সা.)-কে বুঝানো হয়েছে, যাঁর দ্বারা আল্লাহ হক্ক বা সত্যকে আলোকিত করেছেন,ইসলামকে বিজয়ী করেছেন এবং র্শিককে মিটিয়ে দিয়েছেন। কাজেই যে ব্যক্তি তাঁর দ্বারা আলোকিত হতে চায় তার জন্য তিনি আলো। তিনি হক্ক বা সত্য প্রকাশ করেন।তাঁর হক্ককে আলোকিত করার একটি দিক হলো যে, ইহূদীরা আল্লাহর কিতাবের যে সকল বিষয় গোপন করত তার অনেক কিছু তিনি প্রকাশ করেছেন। তাফসীর, তাবারী,৬/১৬১। উপরের আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পেলাম যে, কুরআন কারীমে সত্যের দিশারী, হেদায়াতের আলো ও সঠিক পথের নির্দেশক হিসেবে কুরআন কারীমকে নূরবলা হয়েছে। অনুরূপভাবে কোনো কোনো আয়াতে নূর শব্দের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো মুফাস্সির রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বা ইসলামকে বুঝানো হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন। কুরআন কারীমের এ সকল বর্ণনা থেকে বুঝা যায় না যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.), কুরআন বা ইসলাম নূরের তৈরী বা নূর থেকে সৃষ্ট। আমরা বুঝতে পারি যে, এখানে কোনো সৃষ্ট, জড় বা মূর্ত নূর বা আলো বুঝানো হয় নি। রাসূলুল্লাহ সা., ইসলাম ও কুরআন কোনো জাগতিক, জড়, ইন্দ্রিয়গাহ্য বা মূর্ত আলো নয়। এ হলো বিমূর্ত, আত্মিক, আদর্শিক ও সত্যের আলোকবর্তিকা, যা মানুষের হৃদয়কে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাসের অন্ধকার থেকে বিশ্বাস, সত্য ও সুপথের আলোয় জ্যোতির্ময় করে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এব্যাপারে সঠিক আকীদা পোষণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন। এব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য পাঠককে ইসলামী আকীদা ও হাদীসের নামে জালিয়াতি বইটি পড়তে অনুরোধ করছি।